লিখুন
ফলো

আমাদের নতুন খবর গুলো পেতে এখনি সাইন আপ করুন

পাস্তাঃ যে খাবার ছাড়া ইতালিয়ানরা এক প্রকার অসম্পূর্ণ

পাস্তা যা এখনকার দিনগুলোতে খাবারের মধ্যে খুবি জনপ্রিয় একটা নাম। সন্ধ্যা বেলায় ঘরে-বাইরে কোন খাবারের কথা যদি বলা হয় তাহলে কারো কারো পছন্দের প্রথম সারিতেই থাকে পাস্তা।

আজকে আমরা জানবো অত্যন্ত মুখরোচক এই খাবার নিয়ে যা আমাদের কম বেশি সবারই পছন্দের তালিকায় আছে। খাবারটি হচ্ছে ইটালির বেশ বিখ্যাত খাবার পাস্তা। যা অনেক কাল ধরেই বিখ্যাত হয়ে আছে এর গুণগত মান, স্বাদ, মানুষের পছন্দনীয় খাবারে স্থান নিয়ে। আটা, গম দিয়ে বানানো খুবই সুস্বাদু এই খাবার আজকের এই জনপ্রিয় স্থানে আসার পথ এতটাই মসৃণ ছিল না। আজ থেকে প্রায় কয়েকশো বছর আগে প্রথম আবিষ্কার হয় এই পাস্তা। এর আবিষ্কারের ইতিহাস, প্রস্তুত প্রণালি, ঠিক কি কারণে বেশ জনপ্রিয় হয়, এর পেছনে কারা বেশ শ্রম দিয়েছিলেন বা কাদের হাত ধরে আজকের এই সারা বিশ্ব বিখ্যাত হাজার হাজার নতুন ব্র্যান্ড নিত্যদিন তৈরি করছে পাস্তা সব বিস্তারিত জানবো।

পাস্তার ইতিহাস
পাস্তা
Image Source: Google
পাস্তা শব্দটি এসেছে ইতালির পেস্ট শব্দ থেকে। আটা আর পানির মিশ্রণে বা এক প্রকার পেস্ট থেকে তৈরি হয় বলে এর নাম পাস্তা নামকরণ হয়েছে।

ইতালিয়ান বিখ্যাত খাবার পাস্তা ইতালিয়ানদের কাছে স্রেফ একটি খাবারের নাম না, তাদের কাছে এক অন্য রকম আবেগ। এই খাবার ছাড়া ইতালিয়ানরা এক প্রকার অসম্পূর্ণ। প্যাঁচানো গোলাকৃতির কিংবা লম্বা আকৃতির খাবারের পেছনে রয়েছে বেশ সুদীর্ঘ এক ইতিহাস। ইতালির এই খাবার আবিষ্কারের পেছনে অনেকের অনেক মত আছে। জানা যায়, ভেনিসিয় পর্যটক মার্কো পোলোর লেখা অনুযায়ী অনেকেই বিশ্বাস করেন পাস্তা ইনি চীন থেকে সুদূর ইতালিতে নিয়ে এসেছিলেন। মার্কো পোলো বণিকও ছিলেন। তিনি ১৩ শতাব্দীর বেশ বিখ্যাত একজন পর্যটক ছিলেন। তার লেখায় এক ধরণের গাছের কথা উল্লেখ আছে যা থেকেই পাস্তার উদ্ভব ঘটে।

ঠিক পাস্তা না, তবে পাস্তার মতো সেই খাবারের প্রণালীর গাছটির নাম সাগু পাম ছিল বলে অনেকে ধারণা করেন। তবে পোলোর আগে থেকেই ইতালিতে পাস্তার প্রচলন ছিল বলেও জানা যায় অনেক তথ্য থেকে।

পাস্তার অনেককাল পরে খাবারের তালিকায় যুক্ত হয়েছিলো ম্যাকারনি। ম্যাকারনির ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় সর্বপ্রথম ১২০৭ সালে, ইতালির এক সৈনিকের কাছে। বেশ কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে, পাস্তার প্রথম ধারণা পাওয়া যায় আল ইদ্রিসের লেখায়। বিভিন্ন লেখা থেকে এটাই বুঝা যায় যে পাস্তা কেবল ইতালিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রাক রোমান ইতালিতেও এর ভালোই প্রচলন ছিল।  যদিও নানান খাদ্য বিশারদদের এ নিয়ে বেশ বিতর্কের গুঞ্জন উঠেছিলো। বর্তমানে প্রায় ছয়শোরও অধিক আকৃতির পাস্তা বানানো হয়।

আরেক ইতিহাসে উঠে এসেছে, প্রাচীন রোমকেই পাস্তার আসল আবিষ্কারক দেশ হিসেবে গণ্য করা হতো। সুজিতে পানি মিশিয়ে সেটা দিয়েই পাস্তা বানাতেন তখনকার মানুষরা। পাস্তার প্রচলন আয়োজন করে বানানো শুরু করে  ইতালির দক্ষিণ শহর পালের্মোতে। বর্তমান পাস্তার রেসিপিতে বেশ পরিবর্তন এসেছে লক্ষ্য করা যায়। পাস্তা শুষ্ক হওয়ায় এবং পুষ্টিগুণের জন্য এটি সমুদ্র যাত্রায় ব্যবহারের জন্য বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইতালির পাস্তা এক সময় ধীরে ধীরে নেপলসের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। এবং এক পর্যায়ে সপ্তদশ শতাব্দীতে ঝেঁকে বসে স্থান দখলও করে নেয়।
পাস্তার প্রস্তুত প্রণালী
Image Source: Google
ইতালিয়ান পাস্তার প্রস্তুত প্রণালীতে বেশ কিছু উপাদানের কথা উল্লেখ আছে। পাস্তার খামি বানাতে উত্তর ইতালিতে ময়দা ও ডিম ব্যবহার করতো। আবার দক্ষিণ ইতালিতে পাস্তা তৈরি হতো বেশ ভালো মানের সুজি আর পানির মিশ্রণ দিয়ে। সারা ইতালিতে সবচেয়ে ভালো এবং টাটকা পাস্তা তৈরি হয় এমিলিয়া রোম্যাগনা এলাকায়। এমিলিয়াতে পাস্তা পরিবেশন করা হয় ক্রিম সসের সাথে। এছাড়া মাখন, ব্ল্যাক ট্রুফল দিয়েও পাস্তার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পাস্তায় আলু বা চিজেরও ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। টাটকা পাস্তা, শুষ্ক পাস্তা দুই ধরণের পাস্তারই চল ছিল ইতালিতে।
শুষ্ক পাস্তার জন্য ব্যবহার করা হতো এক বিশেষ যন্ত্র। পাস্তার যে খামি থাকে সেই খামির ডাই মেশিনের ছিদ্রযুক্ত প্লেটের মধ্যে চালান করে দেয়া হয়। ডাই মেশিন হচ্ছে পাস্তা তৈরির কাজে ব্যবহৃত এক প্রকার কাটার যন্ত্র। প্লেটের মধ্যে রাখার পর এগুলোকে বিভিন্ন আকৃতিতে কেটে শুকানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। পাস্তাকে প্রায় পনেরো ঘণ্টারও বেশি কিছু সময় ধরে একটি তামার পাত্রে শুকাতে দেয়া হয়। ইতালিয়ানদের পাস্তার আসল রহস্য তাদের বানানোর ধরণ, স্বাদের মান, এবং তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে বানানো এক অদ্ভুত মজাদার সসের ভেতরে।
পাস্তার বিভিন্ন আকৃতিতে বানানো হয়। এই আকৃতির উপর যদিও এর গুনগত মান নির্ভর করে না। এর স্বাদ বরাবরই প্রশংসার দাবীদার। বিভিন্ন আকৃতির পাস্তার বিভিন্ন নামও রয়েছে। এই মজার ব্যাপারটাই হয়েছে ইতালিতে। ক্যাম্পানেলি নামের এক পাস্তার আকৃতি ছোট ছোট ঘণ্টার মতো। এগুলো বেশ কিছুটা চ্যাপ্টা আকৃতির হয়। এই পাস্তায় চীজেরও ব্যবহার ছিল।
এছাড়া কাপুন্তি নামের আরেক পাস্তার নাম উঠে এসেছে। এটি দেখতে অনেকটাই মটরশুঁটির খোসার মতো। দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও সুস্বাদু। ইতালির আরেক পাস্তার নাম হচ্ছে ক্যাজারেচ্চে। ইতালিয়ানদের মতে এটি ঘরে তৈরি হয় তাই এর এমন নামকরণ। এটির আকৃতি অনেকটাই ইংরেজি অক্ষর S এর মতো।
শামুকের খোলের মতো এক প্রকার পাস্তা আমরা এখন কম বেশি সবাই খেয়ে থাকি। এটির নাম কিন্তু ইতালিয়ানরা দিয়েছিলো কনচিগ্নি। এছাড়া ক্রেস্টে ডি গ্যাল্লো, করজেট্টি, কনচিগ্লিওনি, ফ্যান্টেলিওনি, ফারফ্যাল্লে, ফিওরেন্টিন, ফিওরি, ফুসিলি, ফুসিলি বুকাটি, ফগলি ডুলিভো ইত্যাদি নামেরও বেশ অসংখ্য প্রকার পাস্তার নাম ইতিহাসে জানা যায়। এর একেকটি পাস্তার আকৃতি একেক রকমের হয়ে থাকে। কখনো স্প্রিং এর মতো দেখতে, কখনো ছোট ফুলের মতো দেখতে, বা সর্পিলাকার বাঁকানো, আবার প্রজাপতির মতোও দেখতে পাস্তার জন্ম দিয়েছে এই ইতালিয়ানরা।
Image Source: Google



চলুন জানা যাক আরও বেশ কিছু পাস্তার নাম এবং এর আকৃতি সম্পর্কে।
পাস্তিনা নামের এক পাস্তা দেখতে গোলাকৃতির। এটি একিনি ডি পেপে পাস্তার মতো দেখতে কিছুটা। একিনি ডি পেপে পাস্তা দেখতে মুক্তোর দানার মতো।
এনেলি নামের পাস্তাটি ছোট রিং এর মতো দেখতে। কোরাল্লিনি নামের এক পাস্তা দেখতে টিউবের মতো। ডিটালি, এই পাস্তার আকৃতি ডিটালিনের মতোই তবে কিছুটা বড়।
ফিলিন নামেরও এক পাস্তা আছে। ফিলিন নামের অর্থ সুতা। এটি ফিডেওসের ক্ষুদ্র এক প্রকরণ। ফিডেওস পাস্তার আকৃতি খাটো এবং পাতলা। ইতালিয়ানরা ব্যাঙের ছাতার আকৃতিরও পাস্তা তৈরি করেছিলেন। এর নাম ফুঙ্গিনি।
ভাতের উপকরণ চালের মতো ছোট ছোট আকৃতির পাস্তার নাম ওরজো। একিনি ডি পেপের চেয়ে আকৃতিতে একটু বড় আকারের পাস্তাকে বলা হয় পার্ল পাস্তা। রিসি নামের এক পাস্তা, যা দেখতে ওরজোর মতো তবে কিছুটা ছোট আকৃতির। এক প্রকার পাস্তা আছে যার ভেতরে নানান চিজ, মাংস বা সবজির মিশ্রণ দেয়া হয়ে থাকে। এমন পাস্তার অনেক পাস্তার সন্ধান পাওয়া যায়।
ক্যানেলনি পাস্তা দেখতে বড় বড় টিউবের আকৃতির হয়ে থাকে। এই পাস্তা পুর দিয়ে ওভেনে রান্না করা হয়। পেলমনি নামের এক পাস্তাইয় মাংসের পুর দেয়া হয়। এই পাস্তাগুলো সাধারণত ব্রথে ডুবিয়ে পরিবেশন করা হত।
পাস্তা খেতে সসের ব্যবহার যেন আবশ্যক! নানান ধরণের সসের সাথে পাস্তার স্বাদ নিতে দেখা যেত ইতালিয়ানদের। বিভিন্ন ধরণের পাস্তা যেমন পাতলা, চিকণ, লম্বা এই আকৃতির পাস্তা স্প্যাগেটি, এঞ্জেল হেয়ার ইত্যাদি পাস্তায় সবচেয়ে বেশি মানানসই সস হচ্ছে হালকা চালের সস অথবা টমেটোর এবং রসুনের সস। এটি পাস্তাকে আরও মজাদার করে তুলতে সক্ষম।
ফিতের মতো লম্বাটে পাস্তার জন্য আদর্শ সস হচ্ছে ঘন ক্রিমি সস। এই পাস্তা চ্যাপ্টাকৃতির বলে এর ভেতরে ক্রিম খুব সহজেই ঢুকে যেতে পারে এবং বেশ মজাদার হয়ে উঠে। তরল সস, ঘন সস, ক্রিমি সস, টক কিংবা লাল মরিচের টুকরো দিয়েও পাস্তা খাওয়া যায়।
অতি সুস্বাদু এই পাস্তার এক সময় সারা বিশ্বে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এর জনপ্রিয়তা একেক দেশ হয়ে ভ্রমণ করে এখন আমাদের দেশেও প্রবেশ করেছে। ইতালিয়ানদের এই খাবারটি এখন আমাদের দেশেও যে কেউ ওভেনে কিংবা প্যান ফ্রাইড পাস্তা বানিয়ে উপভোগ করতে পারে।

This is a Bangla Article. Here, everything is written about the PASTA
All links are hyperlinked
The featured image is taken from Google
Total
1
Shares
4 comments
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

 
Previous Article

কখনো আসেনি (১৯৬১) : পরিচালনায় জহির রায়হান নামক জিনিয়াসের আবির্ভাব

Next Article

মাহেশিন্তে প্রাথিগারাম (২০১৬) : ইন-ডেপথ ক্যারেক্টার স্টাডি, বাটারফ্লাই ইফেক্ট এবং জীবনের বয়ে চলা

 
Related Posts
আরও পড়ুন

ভিয়েতনাম যুদ্ধ: মার্কিন বাহিনীর পরাজয় (পর্ব-২)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ বাহিনীর সহায়তায় ফরাসিরা দক্ষিণ ভিয়েতনামের তাবেদার সরকারের উপর চাপ অব্যাহত রাখে। ১৯৫৪ সালের প্রথমদিকে…
আরও পড়ুন

ইহুদী বাদী ইসরায়েলের ইতিহাস (৬ষ্ঠ পর্ব): ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের বর্তমান অবস্থা

মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় একটি ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের জন্মের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ইসরাইলী রাষ্ট্রের…
আরও পড়ুন

রসগোল্লা এবং তার অজানা তথ্য

আমাদের বাঙ্গালীদের  জীবনের অন্যতম বিষয় হচ্ছে রসগোল্লা। যে কোন অনুষ্ঠানের শেষ পাতে রসগোল্লার ছাড়া যেন আমাদের চলেই না।…
আরও পড়ুন

দ্বিচক্রযান বা সাইকেল : যেভাবে ইতিহাসের পথে চলতে চলতে বর্তমান রুপ পেলো সাইকেল [পর্ব : ১]

বাইসাইকেল শব্দের অর্থ হলো দ্বিচক্রযান। এই দ্বিচক্রযান বা বাইসাইকেল চেনে না এমন মানুষ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমরা…

আমাদের নিউজলেটার জন্য সাইন আপ করুন

আমাদের নতুন খবর গুলো পেতে এখনি সাইন আপ করুন

Sign Up for Our Newsletter